Physical Address
304 North Cardinal St.
Dorchester Center, MA 02124
Physical Address
304 North Cardinal St.
Dorchester Center, MA 02124

বাংলার পথে, জীবনের সাথে !

বাংলার পথে, জীবনের সাথে !

বান্দরবান জেলা প্রতিনিধিঃ
২৮ অক্টোবর ২০২৫, সকাল ৮টা। পার্বত্য বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার শীলবুনিয়া পাড়া যেন জেগে উঠেছিল এক প্রাণের দাবিতে। স্থানীয় বৌদ্ধ সমাজের উদ্যোগে “ভূমি রক্ষা ও লামা উপজেলা প্রশাসনের ষড়যন্ত্রের প্রতিবাদে” আয়োজিত হয় এক মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল।
মারাইংতং পাহাড় ঘিরে এই প্রতিবাদ শুধু ভূমি রক্ষার ডাক নয়—এটি ছিল আলীকদমবাসীর আত্মপরিচয়ের, ঐতিহ্যের, বিশ্বাসের প্রতিরক্ষা ঘোষণা।
এই ভূমি আলীকদমের হৃদয়ে জন্ম নেওয়া—চট্টগ্রাম অঞ্চলের মানুষ যেমন এর নাম জানে, তেমনি জানে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি সম্প্রদায়ও। মারাইংতং কেবল একটি পাহাড় নয়; এটি ইতিহাসের প্রতীক, বিশ্বাসের নিঃশব্দ রূপ। শত বছরের পুরনো বৌদ্ধ মন্দির এই পাহাড়ের বুকেই দাঁড়িয়ে আছে, সময়ের সাক্ষী হয়ে।
এখানকার মানুষ সকালে মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি শুনে দিন শুরু করে, সন্ধ্যায় প্রদীপ জ্বেলে প্রার্থনা করে পাহাড়ের চূড়ার দিকে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই পাহাড় ঘিরেই তাদের ধর্মীয় জীবন, সংস্কৃতি, ও দৈনন্দিনতা গড়ে উঠেছে।
তবে দুঃখজনকভাবে, সাম্প্রতিক সময়ে মারাইংতংকে ঘিরে সৃষ্টি হয়েছে এক অস্বস্তিকর পরিস্থিতি। স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন—লামা উপজেলার কিছু ব্যক্তি ও প্রশাসনিক অংশের অজ্ঞতা ও সুবিধাবাদী আচরণ এই ভূমির ঐতিহ্যে আঘাত হেনেছে।
আলীকদমবাসীর ভাষায়, “এই ভূমি আলীকদমের, যার প্রতিটি ইঞ্চিতে আমাদের ইতিহাস ও শ্রদ্ধার চিহ্ন রয়েছে। অথচ যারা পরবর্তীতে এসে বসতি গড়েছে—তাদের অজ্ঞতা ও ক্ষমতার অপব্যবহার আজ আমাদের ঐতিহ্যকে বিপন্ন করছে।”
ইতিহাস বলে, লামা অঞ্চলের অনেক মানুষ মূলত পরবর্তীতে এসে এখানে স্থায়ী বসতি গড়েছেন—যাদের অনেকেই বাঙালি স্যাটেলার। তারা হয়তো জানেন না, এই পাহাড়ের প্রতিটি পাথর, প্রতিটি বৃক্ষ আলীকদমবাসীর চেতনার সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
সকাল আটটায় শুরু হওয়া মানববন্ধনটিতে অংশ নেয় স্থানীয় বৌদ্ধ সম্প্রদায়, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, নারী-পুরুষসহ শতাধিক মানুষ। হাতে হাতে প্ল্যাকার্ড, মুখে উচ্চারিত হয় স্লোগান—
“ভূমি রক্ষা মানে অস্তিত্ব রক্ষা”, “মারাইংতং আমাদের ঐতিহ্য, আমাদের প্রাণ”।
মানববন্ধনের পর শীলবুনিয়া পাড়ার প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে এক বিশাল বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। স্থানীয় প্রবীণ বৌদ্ধ নেতা বলেন—
“মারাইংতং পাহাড়ের চূড়ায় শুধু মাটি নয়, রয়েছে আমাদের পূর্বপুরুষের প্রার্থনা, ইতিহাস, আর আত্মা। সেটি রক্ষা করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।”
প্রতিবাদে অংশ নেওয়া অনেকেই বলেন, প্রশাসন যদি স্থানীয় জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতো, তাহলে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো না। মারাইংতং পাহাড় সংরক্ষণ ও উন্নয়ন সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে আলীকদমবাসীর মতামতকে উপেক্ষা করা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠে।
তাদের দাবি—“লামা উপজেলা প্রশাসন যদি এই ভূমিকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করে, তবে তা হবে ঐতিহ্যবাহী ভূমির প্রতি একপ্রকার আগ্রাসন।”
মানববন্ধনে বক্তারা একযোগে দাবি তোলেন—
বক্তাদের মতে, “এই আন্দোলন কোনো রাজনৈতিক বিষয় নয়, এটি আলীকদমবাসীর সংস্কৃতি, ধর্মীয় ঐতিহ্য ও শান্তি রক্ষার লড়াই।”
তারা বলেন—
“আমরা পাহাড়ের সন্তান। মারাইংতং আমাদের গর্ব। আমরা চাই, এই ভূমির ইতিহাস কেউ বিকৃত না করুক; এখানে যেন শান্তি ও সহাবস্থার সুবাস আবারও ছড়িয়ে পড়ে।”
যদি স্থানীয় প্রশাসন ও লামা-আলীকদমবাসী একত্রে সংলাপে বসে, তবে হয়তো এই সুন্দর পাহাড় আবারও শান্তির প্রতীক হয়ে উঠবে—যেমন ছিল শত বছর ধরে।